রেশন কার্ড (Ration Card): যোগ্যতা ও অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতি
ভারতের ভর্তুকির খাদ্যশস্য ব্যবস্থার পরিবারভিত্তিক নথি। বিভাগ ও যোগ্যতা থেকে আবেদন, সংশোধন এবং এক দেশ, এক রেশন কার্ড সুবিধা পর্যন্ত।
০১রেশন কার্ড কী (What is a Ration Card)?
রেশন কার্ড হল পরিবারভিত্তিক নথি। রাজ্যের খাদ্য ও অসামরিক সরবরাহ দপ্তর এটি দেয়। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন (NFSA) অনুযায়ী গণবণ্টন ব্যবস্থার (PDS) মাধ্যমে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়ার অধিকার এতে প্রমাণিত হয়। ভর্তুকির রেশন ছাড়াও অন্য সরকারি প্রকল্পে এটি ঠিকানা ও পরিবারের পরিচয়ের নথি হিসেবে সচরাচর গ্রহণযোগ্য।
গণবণ্টন ব্যবস্থা চালায় রাজ্য সরকার। তাই আবেদনের নিয়ম, কার্ডের বিভাগ ও আয়সীমা রাজ্যে রাজ্যে কিছুটা আলাদা। তবে মূল কাঠামো এবং জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের কাঠামো সারা দেশে এক।
০২রেশন কার্ডের বিভাগ
| বিভাগ | কাদের জন্য |
|---|---|
| অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (AAY) | সবচেয়ে দরিদ্র পরিবার: ভূমিহীন শ্রমিক, বিধবা, আদিম জনজাতি পরিবার, দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, প্রবীণ নাগরিক ও এমন অন্য অসহায় গোষ্ঠী |
| অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পরিবার (PHH) | SECC ২০১১-তে চিহ্নিত যেসব পরিবার রাজ্যের নির্ধারিত আয়সীমার মধ্যে পড়ে। সাধারণত প্রতি সদস্য মাসে ৫ কেজি ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য পান |
| অন্নপূর্ণা যোজনা (AY) | ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রবীণ নাগরিক, যাঁদের স্থায়ী আয় বা পেনশন নেই। বিনামূল্যে খাদ্যশস্য পান |
| অ-অগ্রাধিকার / সাদা কার্ড | রাজ্যের আয়সীমার ওপরের পরিবার। সাধারণত ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য মেলে না, তবে পরিচয় বা ঠিকানার নথি হিসেবে কাজে লাগে |
০৩যোগ্যতা
- ভারতীয় নাগরিকত্ব, এবং যে রাজ্যে আবেদন করছেন সেখানে স্থায়ী বাসস্থানের ঠিকানা
- আবেদনকারী বা তাঁর পরিবারের অন্য কোনও রাজ্যে রেশন কার্ড না থাকা, এবং একই রাজ্যে ডুপ্লিকেট কার্ড না থাকা
- আবেদন করা বিভাগের জন্য নির্ধারিত আয়ের গোষ্ঠীর মধ্যে পড়া, অর্থাৎ AAY, PHH বা সাধারণ/অ-অগ্রাধিকার কার্ড, রাজ্য যেভাবে ঠিক করেছে সেই অনুযায়ী
বহু রাজ্য সম্পদভিত্তিক বাদ দেওয়ার শর্তও রাখে। যেমন চার চাকার গাড়ি, বড় আবাসিক জমির মালিকানা বা নির্দিষ্ট বার্ষিক আয় ছাড়ালে। এতে সচ্ছল পরিবারগুলি ভর্তুকির বিভাগের বাইরে থাকে। এই সীমা রাজ্যভেদে আলাদা, তাই আবেদনের আগে প্রযোজ্য শর্ত দেখে নেওয়া ভাল।
০৪প্রয়োজনীয় নথি
- পরিচয়ের প্রমাণ: পরিবারের প্রধান ও অন্য সদস্যদের আধার কার্ড বা ভোটার আইডি
- ঠিকানার প্রমাণ: সাম্প্রতিক ইউটিলিটি বিল, ভাড়ার চুক্তিপত্র বা অনুরূপ নথি
- আয় বা BPL সার্টিফিকেট, আবেদনের বিভাগে যেখানে লাগে
- পাসপোর্ট মাপের ছবি, পরিবারের সদস্যদের, রাজ্যের নির্দিষ্ট করা মাপে
- ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, যেসব রাজ্যে রেশন কার্ডের ভর্তুকি সরাসরি ব্যাংকে (DBT) যায়
০৫অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে
প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের খাদ্য ও অসামরিক সরবরাহ বা PDS পোর্টালের মাধ্যমে চলে। প্রায় সব রাজ্যেই ধাপগুলি মোটামুটি একই রকম।
- রাজ্যের রেশন কার্ড/PDS পোর্টালে মোবাইল নম্বর ও ইমেল ঠিকানা দিয়ে রেজিস্টার করুন।
- পরিবারের সদস্য ও আয়ের তথ্য-সহ আবেদনপত্র পূরণ করুন।
- প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন এবং রেশন নেওয়ার জন্য নিকটতম ন্যায্য মূল্যের দোকান (রেশন দোকান) বেছে নিন।
- পূরণ করা আবেদন যাচাই করে জমা দিন।
- জমা দেওয়ার পর তৈরি হওয়া আবেদন রেফারেন্স নম্বর লিখে রাখুন। আবেদন ট্র্যাক করতে এটি লাগে।
প্রায় সব রাজ্যে অফলাইনেও আবেদন করা যায়। স্থানীয় ন্যায্য মূল্যের দোকান বা অসামরিক সরবরাহ দপ্তর থেকে ফর্ম নিয়ে পূরণ করে নথির ফোটোকপি-সহ জমা দিতে হয়।
০৬স্ট্যাটাস দেখা ও ই-রেশন কার্ড ডাউনলোড
- আবেদনের অবস্থা: রাজ্যের PDS পোর্টালের স্ট্যাটাস দেখার অংশে রেফারেন্স নম্বর লিখুন।
- বর্তমান রেশন কার্ড খোঁজা: রাজ্য পোর্টালের রেশন কার্ড পরিষেবার অংশে নাম, ঠিকানা বা আধার-সংযুক্ত তথ্য দিয়ে খুঁজে ডিজিটাল কপি দেখা ও নামানো যায়।
- NFSA পোর্টালে আধারের মাধ্যমে: “Citizen Corner” খুলে “Know Your Ration Card Status” বেছে আধার নম্বরের সঙ্গে যুক্ত অবস্থা দেখা যায়।
০৭এক দেশ, এক রেশন কার্ড (ONORC)
ONORC-এর সুবিধায় রেশন কার্ডধারী নিজের নথিভুক্ত দোকান ছাড়াও দেশের যে কোনও ন্যায্য মূল্যের দোকান থেকে প্রাপ্য খাদ্যশস্য তুলতে পারেন। কাজের খোঁজে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের পক্ষে এটি বিশেষ উপকারী। সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেই এই সুবিধা চালু আছে। বিক্রির সময় আধারভিত্তিক বায়োমেট্রিক বা OTP যাচাই হয় এবং প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত থাকে।
নিজের রাজ্যের বাইরের দোকানে ONORC ব্যবহার করতে সাধারণত রেশন কার্ডে আধার যুক্ত থাকা এবং ধারকের বায়োমেট্রিক UIDAI-এর তথ্যের সঙ্গে মেলা দরকার। তাই আগেভাগে রেশন কার্ডে আধার eKYC সেরে রাখলে কাউন্টারে হয়রানি এড়ানো যায়।
০৮রেশন কার্ডে আধার eKYC
এখন বেশির ভাগ রাজ্যে রেশন কার্ডে নাম থাকা প্রত্যেক সদস্যকে আধারভিত্তিক eKYC করতে হয়। এতে ডুপ্লিকেট বা অযোগ্য নাম বাদ পড়ে এবং ONORC চালু করা যায়। এটি দু’ভাবে হয়।
- বায়োমেট্রিক: ন্যায্য মূল্যের দোকানের পয়েন্ট-অফ-সেল যন্ত্রে আঙুলের ছাপ বা আইরিস স্ক্যান, যা UIDAI-এর তথ্যের সঙ্গে মেলানো হয়
- OTP-ভিত্তিক: আধারে যুক্ত মোবাইল নম্বরে OTP আসে, তা দোকানে বা রাজ্য পোর্টালে দিতে হয়
eKYC অসম্পূর্ণ থাকলে বেশ কয়েকটি রাজ্যে নিষ্ক্রিয় সদস্যদের প্রাপ্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে। তাই পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের eKYC আগে সেরে ফেলা জরুরি।
০৯পশ্চিমবঙ্গের রেশন কার্ড পরিষেবাবিশেষ
পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব ডিজিটাল রেশন কার্ড ব্যবস্থা আছে, পশ্চিমবঙ্গ গণবণ্টন ব্যবস্থা (WBPDS)। রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তর তা চালায়। এখন রাজ্যের প্রতিটি রেশন কার্ডই ডিফল্টভাবে ডিজিটাল (ভার্চুয়াল) কার্ড। সঙ্গে রাখার মতো কোনও বইয়ের দরকার নেই। ন্যায্য মূল্যের দোকানে কার্ডের নম্বর দিয়ে যাচাই হয়।
রাজ্যের নিজস্ব বিভাগ
| বিভাগ | মাসিক প্রাপ্য |
|---|---|
| RKSY I (রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনা) | প্রতি জনে ৫ কেজি চাল |
| RKSY II | প্রতি জনে ২ কেজি চাল |
| AAY | পরিবার পিছু ২১ কেজি চাল + ১৪ কেজি গম (অথবা ১৩.৩ কেজি ফর্টিফায়েড আটা) |
| PHH / SPHH | জন প্রতি ৩ কেজি চাল + ২ কেজি গম (অথবা ১.৯ কেজি ফর্টিফায়েড আটা)। SPHH-তে থাকেন অ-অগ্রাধিকার পরিবারের সেই সদস্যরা, যাঁদের গুরুতর অসুখের চিকিৎসা চলছে। তাঁদের প্রাপ্য PHH-এর সমান |
RKSY I ও RKSY II, AAY/PHH কাঠামোর বাইরে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব রাজ্য-অর্থায়িত সংযোজন। ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি চালু হওয়া খাদ্যসাথী কর্মসূচির আওতায় কেন্দ্রীয় NFSA তালিকার বাইরে থাকা বাসিন্দাদের কাছে ভর্তুকির চাল পৌঁছে দিতে এটি আনা হয়।
নথি ও যোগ্যতা
- একটি বৈধ মোবাইল নম্বর, পোর্টালে OTP যাচাইয়ের জন্য
- আবেদনকারী ও পরিবারের সদস্যদের আধার কার্ড
- ভোটার আইডি (EPIC) বা প্যান কার্ড
- বয়সের প্রমাণ, এবং আগে রেশন কার্ড থাকলে সেটি
- পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী বাসস্থান, এবং আবেদনকারীর নামে আগে থেকে কোনও রেশন কার্ড না থাকা
সদ্য বিবাহিত দম্পতি এবং আগে যাঁরা জরুরি খাদ্য স্ট্যাম্পের ওপর নির্ভর করতেন, রাজ্যের ব্যবস্থায় এই দুই পক্ষই নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন বলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে।
আবেদন করবেন যেভাবে
- পশ্চিমবঙ্গ খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের পোর্টাল food.wb.gov.in-এ গিয়ে নতুন বা অ-ভর্তুকির রেশন কার্ডের আবেদনের বিকল্প খুলুন।
- মোবাইল নম্বর দিয়ে PIN/OTP চেয়ে নিন এবং যাচাই করুন।
- কার্ডের বিভাগ বেছে ব্যক্তিগত ও ঠিকানার তথ্য দিয়ে ফর্ম পূরণ করুন।
- “Enter Another Member” বিকল্প দিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের যোগ করুন, তার পর আবেদনটি সেভ করে প্রিভিউ দেখুন।
- জমা দিয়ে তৈরি হওয়া নিবন্ধন নম্বর লিখে রাখুন। পরে আবেদন ট্র্যাক করতে এটি লাগে।
অফলাইন পথও আছে। একই পোর্টাল থেকে ফর্ম নামিয়ে পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথি জুড়ে স্থানীয় রেশনিং সুপারভাইজার, ইন্সপেক্টর বা ফুড সাপ্লাই এক্সিকিউটিভের কাছে জমা দেওয়া যায়।
সংশোধন, আধার সংযুক্তি ও স্ট্যাটাস
- তথ্য সংশোধন: food.wb.gov.in-এর Citizen Home অংশে রেশন কার্ডের সেলফ-সার্ভিস এলাকায় গিয়ে Rectify/Update বেছে নিন। এতে wbpds.wb.gov.in-এর ডিজিটাল পোর্টাল খোলে। সেখানে রেশন কার্ড নম্বর দিলে সংশোধনের ফর্ম আসে।
- আধার সংযুক্তি: দপ্তরের ওয়েবসাইটে লগ ইন করে WBPDS-এর আধার-লিঙ্ক বিকল্প খুলে রেশন কার্ড ও আধারের তথ্য দিন। অথবা আধারের স্ক্যান করা কপি ও রেশন কার্ডের ফোটোকপি নিকটতম খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরে জমা দিন।
- স্ট্যাটাস দেখা: wbpds.wb.gov.in-এর স্ট্যাটাস অংশে নিবন্ধন বা রেশন কার্ড নম্বর দিয়ে আবেদন বা সংশোধনের অনুরোধের অবস্থা দেখা যায়।
১০সরকারি লিঙ্ক ও হেল্পলাইন
১১প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
একটি পরিবার কি একাধিক রেশন কার্ড রাখতে পারে?
না। একটি পরিবার শুধু একটিই রেশন কার্ডের অধিকারী। এক রাজ্যে বা একাধিক রাজ্যে ডুপ্লিকেট কার্ড রাখা অনুমোদিত নয়, এতে কার্ড বাতিল হতে পারে।
রেশন কার্ডের আবেদনে কি ফি লাগে?
বেশির ভাগ রাজ্যে ফি নামমাত্র বা মকুব। কয়েকটি রাজ্যে সামান্য প্রক্রিয়াকরণ ফি লাগতে পারে। আবেদনের আগে রাজ্যের PDS পোর্টালে সঠিক অঙ্ক দেখে নেওয়া ভাল।
ONORC পরিযায়ী শ্রমিকদের কীভাবে সাহায্য করে?
এর ফলে রেশন কার্ডধারী নিজের নথিভুক্ত ঠিকানার দোকান ছাড়াও দেশের যে কোনও ন্যায্য মূল্যের দোকান থেকে প্রাপ্য খাদ্যশস্য তুলতে পারেন। এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাতায়াত করা শ্রমিকদের জন্য এটি বিশেষভাবে কাজের।
কোনও সদস্যের আধার eKYC সম্পূর্ণ না হলে কী হয়?
বেশ কয়েকটি রাজ্য eKYC অসম্পূর্ণ থাকা সদস্যদের সক্রিয় রেশন কার্ডের প্রাপ্য থেকে বাদ দিতে শুরু করেছে। তাই তালিকার প্রত্যেক সদস্যের eKYC সম্পূর্ণ করে রাখলে সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থাকে না।
অন্য রাজ্যে চলে গেলে কি রেশন কার্ড সঙ্গে নেওয়া যায়?
সাধারণত পুরোনো রাজ্যে কার্ড জমা দিয়ে নতুন রাজ্যে নতুন করে আবেদন করতে হয়, কারণ PDS-এর নিবন্ধন নির্দিষ্ট রাজ্যের ন্যায্য মূল্যের দোকানের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এই সময়টুকুতে ONORC-র মাধ্যমে রেশন পাওয়া চালু রাখা যায়।
পশ্চিমবঙ্গে RKSY I আর RKSY II-এর মধ্যে তফাত কী?
দুটিই পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব রাজ্য-অর্থায়িত বিভাগ, জাতীয় AAY/PHH কাঠামোর বাইরে। RKSY I-এ মাসে জন প্রতি ৫ কেজি চাল মেলে, আর RKSY II-এ জন প্রতি ২ কেজি।
সাধারণ NFSA ও রাজ্যভিত্তিক PDS পদ্ধতি অনুযায়ী এই পাতা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়, যা রাজ্যভেদে আলাদা। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও চূড়ান্ত তথ্যের জন্য সবসময় সংশ্লিষ্ট রাজ্যের খাদ্য ও অসামরিক সরবরাহ পোর্টাল বা NFSA সিটিজেন কর্নার দেখুন।
