পাঁচ মাসে ২৪৫৪ ধর্ষণ ও ৬০০ খুন। আরটিআই-তে উঠে এল রাজ্যের অপরাধের পরিসংখ্যান, তথ্য ঘিরে তুঙ্গে তরজা
১০ অক্টোবর ২০২৬| CoreSignal বাংলা
আরটিআই পরিসংখ্যান (West Bengal RTI crime data)
কলকাতা: রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর প্রথম পাঁচ মাসে অপরাধের যে খতিয়ান সামনে এসেছে, তা নিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত বাংলার রাজনীতি। স্টেট ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (SCRB)-র বরাত দিয়ে আরটিআইয়ের (West Bengal RTI crime data) জবাবে জানা গিয়েছে, ১ মে থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত হয়েছে ২৪৫৪টি ধর্ষণ ও ৬০০টি খুন’-এর মামলা। ২৮ সেপ্টেম্বর ওই জবাব দেওয়া হয়। তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই বিজেপি সরকারকে আইনশৃঙ্খলা ও নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে কাঠগড়ায় তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
কোন অপরাধ কতগুলি
ধর্ষণ ও খুন ছাড়াও তালিকায় রয়েছে আরও গুরুতর অপরাধের হিসাব। এসসিআরবি (SCRB)-র তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে খুনের চেষ্টার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে ১৩,১১৪টি। মারধরে গুরুতর জখমের ঘটনা ৩২,৩৪১টি। ন্যাশনাল হেরাল্ডের প্রতিবেদন বলছে, গড় হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ১৭টি ধর্ষণ এবং চারটি খুনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
মাসওয়াড়ি হিসাবে জুলাইয়ে অপরাধ সবচেয়ে বেশি
আরটিআইয়ের জবাবে মাসভিত্তিক যে ছবি উঠে এসেছে, তাতে ধর্ষণের মামলার সংখ্যায় জুলাই স্পষ্টতই আলাদা। ডেকান ক্রনিকলের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী:
| মাস | ধর্ষণ | খুন |
|---|---|---|
| মে | ৩৪৯ | ১২৫ |
| জুন | ৩৮৯ | ১৩৪ |
| জুলাই | ৭৮৬ | ১৩৩ |
| আগস্ট | ৪৫৯ | ১১১ |
| সেপ্টেম্বর (২৪ তারিখ পর্যন্ত) | ৪৭১ | ৯৭ |
খুনের চেষ্টার ক্ষেত্রেও মাসওয়াড়ি পরিসংখ্যান দিয়েছে ন্যাশনাল হেরাল্ড। সেই হিসাবে মে মাসে ২,৯৪৭, জুনে ২,৫৬২, জুলাইয়ে ৩,০৯৬, আগস্টে ২,৪৯৮ এবং ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২,০১১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
আরটিআই কার আবেদনে
ওই আবেদনটি দাখিল করেছিলেন তৃণমূল নেতা ও প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ সাকেত গোখলে। বুধবার তথ্য প্রকাশ করে তৃণমূল তাদের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডলে লেখে, ‘বিজেপি-র আমলে মাত্র পাঁচ মাসে বাংলায় ২,৪০০-র বেশি ধর্ষণ’। দলের প্রশ্ন, বিজেপি যে ‘নিরাপদ বাংলা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এটাই কি তার নমুনা? ডায়নামাইট নিউজের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজেপির ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগানকেই সরাসরি নিশানা করেছে তৃণমূল।
তৃণমূলের আক্রমণ, দাবি বিধানসভা অধিবেশনের
দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিসংখ্যানকে বর্ণনা করেছেন বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ ব্যর্থতার ‘স্ন্যাপশট’ হিসেবে। সমাজমাধ্যমে ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা ও গুরুতর জখমের মোট সংখ্যা তুলে ধরে তাঁর কটাক্ষ, ‘ডাবল ইঞ্জিন’ নয়, বাংলা পেয়েছে ‘ডাবল ইঞ্জিন ডিজাস্টার’। একই সঙ্গে এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) এবং ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ নিয়ে চলতে থাকা রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গেও বিষয়টি জুড়ে দিয়েছেন তিনি।
তৃণমূল বিধায়ক ও মুখপাত্র কুণাল ঘোষ আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনার জন্য অবিলম্বে বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার দাবি তুলেছেন। মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের বিবৃতিও চেয়েছেন তিনি। কুণালের অভিযোগ, এই পরিসংখ্যান ‘পুলিশ রাজ, গুন্ডা রাজ এবং ভয়ের রাজনীতি’র প্রমাণ।
বিজেপির পাল্টা যুক্তি: ‘পুরনো ঘটনার মামলা এখন নথিভুক্ত’
অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার। ডেকান ক্রনিকলের প্রতিবেদন অনুসারে, তাঁর বক্তব্য, তালিকাভুক্ত বহু মামলাই আগের সরকারের আমলে ঘটা অপরাধের, যা কেবল সরকার বদলের পর থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। দেরিতে করা একাধিক অভিযোগের মধ্যে ধর্ষণ ও ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনাও রয়েছে বলে দাবি তাঁর। অপরাধের প্রবণতা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে প্রতিটি ঘটনা কবে ঘটেছে, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত বলেও মত দেবজিৎবাবুর। তিনি এ-ও জানিয়েছেন, অপরাধের ক্ষেত্রে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে।
ন্যাশনাল হেরাল্ড জানিয়েছে, নির্দিষ্ট এই পরিসংখ্যান নিয়ে বিজেপি বিস্তারিত প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া এখনও দেয়নি। যদিও রাজ্য সভাপতি সমীক বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে অপরাধ প্রসঙ্গে বারবার কড়া অবস্থান নিয়েছেন। জুলাইয়ে বারুইপুরের ধর্ষণ-খুনের ঘটনার পর তিনি বলেছিলেন, ধর্ষণ বা খুনের অপরাধীদের ছাড়া হবে না, হয় তাঁরা জেলে থাকবেন, নয়তো তাঁদের মৃত্যু হবে। সেপ্টেম্বরে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তিনি জানান, হিংসা ও তোলাবাজির ক্ষেত্রে দল ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলছে।
তুলনামূলক তথ্য নেই, প্রশ্ন সেখানেই
আরটিআইয়ের জবাবে একটি বড় ফাঁক রয়েছে। ন্যাশনাল হেরাল্ডের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ক্ষমতার বদলের আগের কোনও সময়ের সঙ্গে তুলনামূলক তথ্য এতে নেই। ফলে সরকার বদলের পর অপরাধ আদৌ বেড়েছে কি না, এই পরিসংখ্যান থেকে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এখানে ধরা আছে শুধু ওই সময়ে থানায় নথিভুক্ত অভিযোগের সংখ্যা। কোন ঘটনা কবে ঘটেছিল, তার হিসাব নেই। বিজেপি ঠিক এই জায়গাতেই প্রশ্ন তুলছে।
তৃণমূলের কাছে অবশ্য বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা ও মহিলাদের নিরাপত্তা ছিল বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যু। এখন সেই ইস্যুতেই সরকারকে ঘিরে ফেলতে চাইছে বিরোধী শিবির। আগামী দিনে সরকারি স্তরে তুলনামূলক পরিসংখ্যান প্রকাশ হলে এই বিতর্কের আসল ছবি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
#WestBengal #LawAndOrder #WomenSafety
#NewsWithTN #RS
