পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা (PM Vishwakarma Yojana) ২০২৬: আবেদন পদ্ধতি, যোগ্যতা, নথি ও ₹৩ লক্ষ ঋণের সুবিধা
২০২৬ সালে PM Vishwakarma Yojana-য় নাম নথিভুক্ত করার পূর্ণাঙ্গ গাইড: কারা পাবেন, ঠিক কী কী সুবিধা মিলবে এবং আবেদন আসলে কীভাবে হয়।
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ | CoreSignal বাংলা
আবেদনের আগে যা জানা দরকার
ছুতোর, কামার, দর্জি, কুমোর, স্বর্ণকার, নাপিত বা ঐতিহ্যবাহী অন্য কোনও হাতের কাজের পেশায় যুক্ত থাকলে PM Vishwakarma Yojana এমন একটি প্রকল্প, যা বিশেষভাবে এই কারিগরদের কথা ভেবেই তৈরি। প্রকল্পে একসঙ্গে মেলে সরকারি স্বীকৃতি, ভাতাসহ দক্ষতা প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি কেনার অনুদান এবং কম সুদের ঋণ।
একটি ভুল ধারণা আগেই পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার: “অনলাইন আবেদন” কথাটি শুনে অনেকে ভাবেন, ঘরে বসে ফোন থেকেই পুরো Registration হয়ে যাবে। বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা হয় না। বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো।
PM Vishwakarma Yojana কী?
PM Vishwakarma Yojana (সরকারি নাম PM Vishwakarma Scheme) কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রকল্প, যা চালায় কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) মন্ত্রক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৩ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রকল্পটির ঘোষণা করেন। আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্বকর্মা জয়ন্তীর দিনে। হিন্দু বিশ্বাসে এই দিনটি দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার সঙ্গে যুক্ত।
২০২৩–২৪ থেকে ২০২৭–২৮ অর্থবর্ষ জুড়ে প্রকল্পের মোট বরাদ্দ প্রায় ₹১৩,০০০ কোটি। যাঁরা দক্ষ কারিগর অথচ প্রথাগত ঋণ ও সরকারি স্বীকৃতির বাইরে থেকে গেছেন, সেই অসংগঠিত কারিগর-অর্থনীতির জন্য এটি দেশের অন্যতম বড় উদ্যোগ।
কোন ১৮টি পেশা এই প্রকল্পের আওতায়?
প্রকল্পটি শুধু এই ১৮টি ঐতিহ্যবাহী, পারিবারিক পেশার জন্য:
| ছুতোর | নৌকা নির্মাতা | অস্ত্র নির্মাতা (armourer) |
| কামার | হাতুড়ি ও যন্ত্রপাতি নির্মাতা | তালা মিস্ত্রি |
| স্বর্ণকার | কুমোর | ভাস্কর/পাথর খোদাইকর |
| মুচি | রাজমিস্ত্রি | ঝুড়ি/মাদুর/ঝাড়ু নির্মাতা |
| পুতুল ও খেলনা নির্মাতা | নাপিত | মালাকার (মালা প্রস্তুতকারী) |
| ধোপা | দর্জি | মাছ ধরার জাল নির্মাতা |
লক্ষ্য করুন: তাঁত শিল্পীরা (handloom weavers) এই প্রকল্পের আওতায় পড়েন না। তাঁদের জন্য বস্ত্র মন্ত্রকের আলাদা প্রকল্প রয়েছে। তাই এটিই আপনার পেশা হলে এই প্রকল্পে আবেদন করা ঠিক হবে না।
আসলে কী কী সুবিধা মেলে?
প্রকল্পের সুবিধা ধাপে ধাপে সাজানো, প্রতিটি ধাপ আগেরটির ওপর ভিত্তি করে চলে।
- স্বীকৃতি: PM Vishwakarma সার্টিফিকেট ও ID কার্ড, দুটিই কাগজে এবং ডিজিটালভাবে মেলে। এর মাধ্যমে আপনি আনুষ্ঠানিকভাবে “বিশ্বকর্মা” কারিগর হিসেবে স্বীকৃত হন।
- দক্ষতা প্রশিক্ষণ: সাধারণত ৫–৭ দিনের বেসিক ট্রেনিং এবং ঐচ্ছিক অ্যাডভান্সড ট্রেনিং (প্রায় ১৫ দিন)। প্রশিক্ষণ চলাকালীন দৈনিক ₹৫০০ ভাতা।
- যন্ত্রপাতির অনুদান: পেশার উপযোগী আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ₹১৫,০০০-র e-voucher। বেসিক ট্রেনিং শুরু হওয়ার পর এটি দেওয়া হয়।
- জামানত ছাড়া ঋণ: মোট ₹৩ লক্ষ পর্যন্ত, দুই কিস্তিতে। প্রথমে ₹১ লক্ষ, সেটি সন্তোষজনকভাবে পরিশোধ হলে দ্বিতীয় কিস্তিতে ₹২ লক্ষ। দুই কিস্তিতেই সুদের হার ৫% (concessional rate)।
- ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ ভাতা: ব্যবসায় ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়াতে সামান্য নগদ প্রণোদনা। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী লেনদেনপিছু প্রায় ₹১, মাসে সর্বোচ্চ ১০০টি লেনদেন পর্যন্ত। অঙ্কটি সরকারি সূত্রে যাচাই করে নেওয়া ভালো।
- বিপণনে সহায়তা: GeM (Government e-Marketplace)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার এবং One District One Product (ODOP)-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে বড় বাজারে নিজের কাজ বিক্রির সুযোগ।
Also Read
- পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা (PM Vishwakarma Yojana) ২০২৬: আবেদন পদ্ধতি, যোগ্যতা, নথি ও ₹৩ লক্ষ ঋণের সুবিধা

- অরুণাচলে ভারত-চিন ফেস-অফ (India-China Face-Off in Arunachal Pradesh): একাধিক জায়গায় মুখোমুখি হওয়ার কথা স্বীকার আইটিবিপি প্রধানের

- পাঁচ মাসে ২৪৫৪ ধর্ষণ ও ৬০০ খুন। আরটিআই-তে উঠে এল রাজ্যের অপরাধের পরিসংখ্যান, তথ্য ঘিরে তুঙ্গে তরজা

যোগ্যতার শর্ত
প্রকল্পের সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী সাধারণত নিচের শর্ত পূরণ করলে আবেদন করা যায়:
- বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।
- ১৮টি তালিকাভুক্ত পেশার কোনও একটিতে যুক্ত থাকা, হয় পারিবারিক ঐতিহ্যে, অথবা কোনও নথিভুক্ত সংগঠনের অংশ হিসেবে।
- একই ব্যবসার জন্য সাম্প্রতিক অতীতে PMEGP, PM SVANidhi বা মুদ্রা ঋণের মতো অন্য ঋণ-সংযুক্ত সরকারি প্রকল্পের সুবিধা না নেওয়া। যাচাইয়ের সময় এটি দেখা হয়।
- সাধারণত একটি পরিবার থেকে মাত্র একজন সদস্যই নাম নথিভুক্ত করতে পারেন, যাতে সুবিধা বেশি পরিবারে ছড়ায়।
কোন কোন নথি লাগবে?
শুরুর আগেই এগুলো তৈরি রাখুন:
- Aadhaar কার্ড
- Aadhaar-এর সঙ্গে যুক্ত Mobile Number (OTP যাচাইয়ের জন্য)
- ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ/পাসবই
- রেশন কার্ড (CSC-তে যাচাইয়ের সময় সাধারণত লাগে)
- বসবাসের প্রমাণ
- সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- নিজের পেশা/কারুশিল্প ও কাজের অভিজ্ঞতার বিবরণ
“অনলাইন আবেদন” আসলে কীভাবে হয়?
অনলাইনে এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তিকর তথ্য ঘুরছে। প্রকল্পের একটি সরকারি ওয়েব পোর্টাল আছে ঠিকই, তবে Registration সাধারণত পুরোপুরি ঘরে বসে নিজে করা যায় না। কারণ, প্রক্রিয়ায় বায়োমেট্রিক যাচাই ও e-KYC লাগে। বাস্তব প্রক্রিয়াটি এমন:
- নিকটতম Common Service Centre (CSC)-এ যান। বেশির ভাগ আবেদনকারী CSC অপারেটরের মাধ্যমেই Registration সারেন।
- নথি সঙ্গে নিন: Aadhaar কার্ড, Aadhaar-এর সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ ও রেশন কার্ড।
- CSC অপারেটর আপনার হয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, পেশার ক্যাটাগরি ইত্যাদি জমা দেন এবং বায়োমেট্রিক/e-KYC যাচাই সম্পূর্ণ করেন।
- আবেদন তিন ধাপের যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়:
- গ্রাম পঞ্চায়েত/পুর স্থানীয় সংস্থা (Urban Local Body, ULB) স্তরের যাচাই
- জেলা বাস্তবায়ন কমিটির পর্যালোচনা
- চূড়ান্ত স্ক্রিনিং কমিটির অনুমোদন
- অনুমোদন মিললে PM Vishwakarma সার্টিফিকেট ও ID কার্ড পাওয়া যায়। এর পর পর্যায়ক্রমে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, তারপর যন্ত্রপাতির ভাউচার ও ঋণের কিস্তি শুরু হয়।
Registration ও Application Status-এর তথ্য দেখা যায় সরকারি পোর্টাল pmvishwakarma.gov.in-এ, যদিও প্রথম Registration-এর ধাপে সাধারণত CSC-তে যেতে হয়। Registration সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। Registration-এর জন্য কেউ টাকা চাইলে সতর্ক হোন।
২০২৬-এর Registration পরিস্থিতি
কতজন কারিগর নাম লিখিয়েছেন, তা সূত্র ও তারিখভেদে আলাদা। তাই যেকোনো সংখ্যাকে নির্দিষ্ট সংখ্যা না ভেবে একটি সময়ের হিসাব হিসেবে দেখাই ঠিক। তবে ২০২৬-এর গোড়া থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০২৩-এ প্রকল্প শুরুর পর ২ কোটির বেশি আবেদন জমা পড়েছে। কয়েক কোটি নয়, কয়েক দশ লক্ষ কারিগর প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন এবং ঋণ পেয়েছেন বলেও জানা যায়। বিভিন্ন জেলার বাস্তবায়ন প্রতিবেদন বলছে, Registration ও প্রশিক্ষণের তুলনায় ঋণ বিতরণ সাধারণত ধীরে এগিয়েছে। তাই অনুমোদনে কত সময় লাগবে, তা জেলা এবং ব্যাংকের প্রক্রিয়ার গতির ওপর অনেকটা নির্ভর করে।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
- পুরোপুরি অনলাইনেই Registration হয়ে যাবে ধরে নেওয়া। বেশির ভাগ আবেদনকারীর ক্ষেত্রে এটি ঠিক নয়, এবং এই ধারণা অকারণ বিভ্রান্তি তৈরি করে।
- অননুমোদিত ওয়েবসাইট বা দালালের মাধ্যমে আবেদন। টাকার বিনিময়ে দ্রুত Registration করিয়ে দেওয়ার দাবি করা এজেন্ট বা সাইট এড়িয়ে চলুন। শুধু সরকারি CSC কেন্দ্র বা pmvishwakarma.gov.in পোর্টাল ব্যবহার করুন।
- একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম নথিভুক্ত করা। প্রকল্প সাধারণত পরিবারপিছু একজনের জন্য। দ্বিতীয় আবেদনে দেরি বা বাতিলের ঝুঁকি থাকে।
- দক্ষতা প্রশিক্ষণ এড়িয়ে যাওয়া। যন্ত্রপাতির ভাউচার ও ঋণের কিস্তি প্রশিক্ষণের ধাপের পরে আসে, তাই ধাপ টপকে এগোনো যায় না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ফোন থেকে কি পুরোপুরি অনলাইনে PM Vishwakarma Yojana-য় আবেদন করা যায়?
পুরোপুরি নয়। সরকারি ওয়েব পোর্টাল আছে ঠিকই, কিন্তু Registration-এ বায়োমেট্রিক যাচাই ও e-KYC লাগে। সাধারণত নিকটতম Common Service Centre (CSC)-তে গিয়েই তা সম্পূর্ণ করতে হয়।
২. PM Vishwakarma Yojana-য় Registration-এর কোনও ফি আছে কি?
না, Registration বিনামূল্যে। প্রক্রিয়া “দ্রুত” করে দেওয়ার কথা বলে টাকা চাওয়া কোনও ব্যক্তি বা এজেন্ট থেকে সাবধান থাকুন।
৩. এই প্রকল্পে কত টাকা ঋণ পাওয়া যায়?
মোট ₹৩ লক্ষ পর্যন্ত, দুই কিস্তিতে। প্রথমে ₹১ লক্ষ, সেটি সন্তোষজনকভাবে শোধ হলে দ্বিতীয় কিস্তিতে ₹২ লক্ষ। দুই কিস্তিতেই সুদের হার ৫%।
৪. তাঁত শিল্পীরা কি PM Vishwakarma Yojana-য় আবেদন করতে পারেন?
না। তাঁত শিল্পীদের জন্য বস্ত্র মন্ত্রকের আলাদা প্রকল্প রয়েছে, PM Vishwakarma Yojana-র আওতায় তাঁরা পড়েন না।
৫. একই পরিবারের একাধিক সদস্য কি আবেদন করতে পারেন?
সাধারণত না। বেশি পরিবারের কাছে সুবিধা পৌঁছে দিতে প্রকল্পটি পরিবারপিছু একজন সুবিধাভোগীর জন্য সাজানো।
৬. আবেদনের পর অনুমোদন পেতে কত সময় লাগে?
নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। আবেদন তিন ধাপের যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়: গ্রাম পঞ্চায়েত/ULB, জেলা বাস্তবায়ন কমিটি এবং চূড়ান্ত স্ক্রিনিং। জেলাভেদে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগতে দেখা গেছে।
৭. PM Vishwakarma সার্টিফিকেট পাওয়ার পর কী হয়?
বেসিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ শুরু করার যোগ্যতা মেলে (দৈনিক ভাতাসহ)। তার পর যন্ত্রপাতির অনুদান এবং এর পর ঋণের কিস্তি আসে। সাধারণত আগের ধাপ শেষ হলে পরের ধাপ খোলে।
দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধ সাধারণ তথ্যের জন্য, লেখার সময় প্রকাশিত সরকারি প্রকল্প-তথ্য ও খবরের ভিত্তিতে। যোগ্যতার শর্ত, সুবিধার অঙ্ক ও আবেদন পদ্ধতি MSME মন্ত্রক বদলাতে বা হালনাগাদ করতে পারে। আবেদন করার বা ব্যক্তিগত নথি কাউকে দেওয়ার আগে অফিসিয়াল পোর্টাল pmvishwakarma.gov.in-এ অথবা নিকটতম CSC-তে চলতি তথ্য যাচাই করে নিন।
