অরুণাচলে ভারত-চিন ফেস-অফ (India-China Face-Off in Arunachal Pradesh): একাধিক জায়গায় মুখোমুখি হওয়ার কথা স্বীকার আইটিবিপি প্রধানের
আইটিবিপি-র ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ কাপুর জানিয়েছেন, অরুণাচল সীমান্তের একাধিক জায়গায় চিনা সেনার সঙ্গে ফেস-অফ চলছে। উচ্চ সুবনসিরি জেলার আসাফিলা এলাকা তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজরে।
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ | CoreSignal বাংলা
কয়েক মাস ধরে অরুণাচল প্রদেশে ভারত-চিন ফেস-অফের খবর মূলত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আধিকারিক আর স্থানীয়দের মুখেই ঘুরছিল। এ সপ্তাহে সেই ছবিটা বদলে গেল। সীমান্ত পাহারায় থাকা বাহিনীর প্রধান নিজেই প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করলেন।
ইন্দো-তিব্বতান বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ কাপুর বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, এই মন্তব্য করেন। রাজস্থানের আলওয়ারে সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে বাহিনীর বার্ষিক ‘হিমবীর সম্মান সমারোহ’-এ কর্মীদের সম্মান জানানো হয়। আইটিবিপি-র ৬৫তম প্রতিষ্ঠা দিবসের দু’দিন আগে ছিল সেই অনুষ্ঠান।
অরুণাচলের ফেস-অফ নিয়ে কী বললেন কাপুর (ITBP Chief Kapur Flags Ageing Weapons Amid the India-China Face-Off in Arunachal Pradesh)
দ্য ওয়্যার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাপুর জানান, অরুণাচলের একাধিক জায়গায় ফেস-অফ হয়েছে এবং পরিস্থিতি এখনও চলছে। নতুন গড়া শৌর্য কমান্ডোদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, তাঁরা দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন। উঁচু পার্বত্য এলাকায় লড়াইয়ের জন্য তৈরি এই ইউনিটের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন শীঘ্রই গড়া হবে বলেও জানান তিনি। বিজনেস টুডে-র খবর, তিনি চিনকে ভারতের ‘সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ’ বলেছেন এবং জানিয়েছেন, জুলাই থেকেই এই ফেস-অফের জায়গাগুলিতে পরিস্থিতি সক্রিয়।
কাপুরের কথায়, আইটিবিপি-তে কর্মীসংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার। পাহাড়ি এলাকার গেরিলা যুদ্ধের বাহিনী হিসেবে তৈরি হওয়া আইটিবিপি ২০০৪ সাল থেকে চিন সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে। ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) তারাই প্রথম সারিতে, তাদের পিছনে থাকে সেনাবাহিনী।
আসাফিলা: যেখানে তাঁবু পড়েছে
একই প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের শেষ থেকে সবচেয়ে চর্চিত ফেস-অফ হয়েছে উচ্চ সুবনসিরি জেলার তাকসিংয়ের কাছে আসাফিলায়। সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, নিয়মিত টহলের সময় মাজা কোম্পানি অপারেটিং বেসের কাছে দুই দেশের টহলদার দল মুখোমুখি হয়। সংক্ষিপ্ত সংঘাতের পর দু’পক্ষই ফিরে যায়। কিন্তু কয়েক দিন পরে আরও বেশি সংখ্যায় ফিরে আসে চিনা সেনা। উঁচু জায়গায় তাঁবু খাটায়, ভারত যেখানে এলএসি মনে করে, তার ৬-৭ কিলোমিটার ভিতরে।
আরও পড়ুন
- পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা (PM Vishwakarma Yojana) ২০২৬: আবেদন পদ্ধতি, যোগ্যতা, নথি ও ₹৩ লক্ষ ঋণের সুবিধা

- অরুণাচলে ভারত-চিন ফেস-অফ (India-China Face-Off in Arunachal Pradesh): একাধিক জায়গায় মুখোমুখি হওয়ার কথা স্বীকার আইটিবিপি প্রধানের

- পাঁচ মাসে ২৪৫৪ ধর্ষণ ও ৬০০ খুন। আরটিআই-তে উঠে এল রাজ্যের অপরাধের পরিসংখ্যান, তথ্য ঘিরে তুঙ্গে তরজা

এর পর ওই এলাকায় মোতায়েন বাড়িয়েছে ভারত। আগস্টের শেষে নিউজবাইটস টেলিগ্রাফের একটি প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে জানিয়েছিল, পূর্ব সেক্টরে চিনা সেনা বাড়ার পর আইটিবিপি আরও সীমান্ত চৌকি বসাচ্ছে এবং ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় বাড়তি জওয়ান পাঠাচ্ছে।
অরুণাচলে সংঘাত নতুন নয়
তিব্বতের সঙ্গে অরুণাচলের ১,১২৯ কিলোমিটার সীমান্তে উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাওয়াং সেক্টরের ইয়াংৎসের কাছে ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে সংঘাত হয়েছিল। দু’পক্ষেরই কয়েকজন আহত হন, তার পর সেনা সরে যায়। ২০২৪ সালে আইটিবিপি-র একটি অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে লাদাখ থেকে অরুণাচল পর্যন্ত ১৯টি দুর্বল জায়গার কথা বলা হয়েছিল, যেখানে চিনা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা ছিল। এবারের ঘটনা আলাদা এই কারণে যে, বাহিনীর প্রধান পদে থাকা আধিকারিক নিজে একসঙ্গে একাধিক মুখোমুখি পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন। তার কয়েকটি এখনও মেটেনি।
আলোচনা চলেছে, উত্তেজনাও থামেনি
ফেস-অফের পাশাপাশি দু’দেশের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি:
- ৬ আগস্ট: ভারত-চিন সীমান্ত বিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয় কমিটির (ডব্লিউএমসিসি) ৩৬তম বৈঠক
- ২৬ আগস্ট: বেজিংয়ে বিশেষ প্রতিনিধি স্তরের ২৫তম আলোচনায় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল
- ৬ সেপ্টেম্বর: পূর্ব সেক্টরে প্রথম কোর কমান্ডার স্তরের বৈঠক, অরুণাচলের ভাচা-দামাই বর্ডার পার্সোনেল মিটিং পয়েন্টে
- ১১–১৩ সেপ্টেম্বর: ভারতের আয়োজনে ব্রিকস সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যোগদান
এই ধরনের বৈঠক এত দিন মূলত পূর্ব লাদাখের চুশুল-মোল্ডোতেই হয়েছে, বিশেষ করে ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে। তাই এ বার বৈঠকের জায়গা অরুণাচল হওয়াটা লক্ষণীয়।
ড্রোন, বাংকার আর পুরনো অস্ত্র
বাহিনীর সরঞ্জাম নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন কাপুর। তাঁর কথায়, আইটিবিপি-র অস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরনো। চিন অস্ত্র ও পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করেছে, তাই শুধু চিরাচরিত পদ্ধতিতে তার মোকাবিলা কঠিন হতে পারে বলেও মত তাঁর। সমাধান হিসেবে তিনি ড্রোন ও ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থার কথা বলেন। ৪০০ কোটি টাকার আধুনিকীকরণ তহবিলের ৭০ শতাংশ গিয়েছে ড্রোনে। ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের মধ্যে ১,০০০ কোটি টাকা একই খাতে বরাদ্দ। সীমান্ত পাহারার প্রতিটি ব্যাটালিয়নে এখন একটি করে ড্রোন প্লাটুন আছে, ড্রোন পাইলটদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে এবং কিছু ড্রোন বাহিনী নিজেরাই তৈরি করছে।
ভারী কামান, আকাশপথে হামলা আর প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে জওয়ানদের বাঁচাতে সীমান্তে মাটির নীচে মজবুত আশ্রয়কেন্দ্র ও বাংকারও তৈরি হচ্ছে। বিজনেস টুডে-র খবর, ২০২৭ সালের শেষের আগেই সব ইউনিটে আক্রমণাত্মক প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার কথা।
দিল্লির প্রতিক্রিয়া
কাপুরের মন্তব্যের পর কেন্দ্রকে নিশানা করেছেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। অরুণাচলের ফেস-অফ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ‘কানফাটানো নীরবতা’র কথা বলেছেন তিনি। এ ছাড়াও টহল পয়েন্ট হাতছাড়া হওয়ার খবর, অরুণাচলের জায়গার নাম বদলে দেওয়া চিনের পদক্ষেপ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে চিনের সঙ্গে ভারতের রেকর্ড ১১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির কথাও তুলেছেন।
শুক্রবার সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, চিনা বাহিনী নির্ধারিত টহলের ধরন থেকে সরে এলে সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে অশান্তি তৈরি হয়। নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দিকে ঠেলে তিনি জানান, ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল হিসেব এড়াতে দু’পক্ষ কূটনৈতিক ও সামরিক পথ ব্যবহার করে চলেছে।
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর চিনের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সূত্রগুলিতে মেলেনি। কয়েকটি ফেস-অফ এখনও মেটেনি। তাই শীতে অরুণাচলের এই পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে পরবর্তী দফার সামরিক আলোচনার উপর।
দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদন ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের খবর ও বিবৃতির উপর ভিত্তি করে লেখা। ফেস-অফের জায়গা ও সেনার অবস্থান-সহ অনেক তথ্য সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত সরকারি সূত্র থেকে নেওয়া, কোরসিগন্যাল স্বাধীনভাবে তা যাচাই করেনি। পাঠকদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক, বিদেশমন্ত্রক ও আইটিবিপি-র সরকারি বিবৃতি দেখে নিতে অনুরোধ করা হচ্ছে। সংশোধন বা প্রশ্নের জন্য যোগাযোগ: ask@coresignal.in
