পশ্চিমবঙ্গের মৃত্যুর সনদ (West Bengal Death Certificate): নিবন্ধন ও আবেদনের পদ্ধতি, ধাপে ধাপে
পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যু নিবন্ধন কীভাবে হয়, তা নির্ভর করে কখন করা হচ্ছে তার ওপর: ২১ দিনের মধ্যে, প্রথম এক বছরের মধ্যে, না কি বহু বছর পরে। বিলম্বিত ক্ষেত্রে মহকুমা শাসকের আদেশের অনলাইন পথও এখানে আছে।
০১মৃত্যুর সনদ কী (What is a Death Certificate)?
মৃত্যুর সনদ হল কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর সরকারি নথি। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ১৯৬৯-এর অধীনে নথিভুক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এটি দেন স্থানীয় রেজিস্ট্রার, অর্থাৎ মৃত্যুর স্থান যে গ্রাম পঞ্চায়েত, পুরসভা বা পৌর নিগমের এলাকায় পড়ে, সেখানকার দপ্তর। রাজ্য স্তরে এর তত্ত্বাবধানে থাকেন জন্ম ও মৃত্যুর মুখ্য রেজিস্ট্রার। বিমার দাবি মেটানো, সম্পত্তি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হস্তান্তর, পেনশনের নথি বন্ধ করা এবং উত্তরাধিকারী (লিগ্যাল হেয়ার) বা উত্তরাধিকার সার্টিফিকেট পেতে এটি লাগে।
জন্ম নিবন্ধনের মতোই এখানেও প্রক্রিয়া নির্ভর করে মৃত্যুর কতদিন পরে খবর দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। ২১ দিনের মধ্যে নিবন্ধন বিনামূল্যে ও সহজ। পরে করলে বিলম্ব ফি লাগে, আর এক বছরের বেশি দেরি হলে রেজিস্ট্রার নথিভুক্ত করার আগে কর্তৃপক্ষের আদেশ লাগে।
০২কোন পথ প্রযোজ্য: নিবন্ধনের তিনটি সময়সীমা
০৩সাধারণ নিবন্ধন: ২১ দিনের মধ্যে
হাসপাতালে হওয়া বেশির ভাগ মৃত্যুর খবর প্রতিষ্ঠান নিজেই দেয়। পরিবারকে শুধু সার্টিফিকেট নিতে যোগাযোগ রাখতে হয়।
তৈরি রাখার নথি
- মৃত্যুর কারণ ও সময় লেখা, হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যুর সার্টিফিকেট বা ডিসচার্জ সারাংশ
- বাড়িতে মৃত্যু হলে চিকিৎসকের দেওয়া মৃত্যুর সার্টিফিকেট বা ডেথ স্লিপ
- শ্মশান বা কবরস্থান থেকে পাওয়া দাহ বা সমাধির সার্টিফিকেট
- মৃত ব্যক্তি ও আবেদনকারীর পরিচয়ের প্রমাণ: আধার, ভোটার আইডি বা রেশন কার্ড
- মৃত ব্যক্তির বাসস্থানের প্রমাণ
ছবিতে ধাপগুলি
ধাপে ধাপে
- হাসপাতালে মৃত্যু হলে সাধারণত প্রতিষ্ঠানই রিপোর্ট শুরু করে। পরিবার তা নিশ্চিত করে রেফারেন্স নম্বর নিয়ে নেয়।
- বাড়িতে মৃত্যু হলে পশ্চিমবঙ্গ জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালে গিয়ে মৃত্যুর সনদের আবেদন করুন, অথবা স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত, পুরসভা বা পৌর নিগমের দপ্তরে আবেদন করুন।
- মৃত ব্যক্তির তথ্য, মৃত্যুর তারিখ, সময় ও স্থান এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে আবেদনকারীর সম্পর্ক লিখুন।
- হাসপাতাল বা চিকিৎসকের মৃত্যুর সার্টিফিকেট, দাহ/সমাধির সার্টিফিকেট এবং মৃত ব্যক্তি ও আবেদনকারী দু’জনের পরিচয়ের প্রমাণ আপলোড করুন।
- আবেদন জমা দিন। ২১ দিনের মধ্যে কোনও ফি লাগে না।
- জমা দেওয়ার সময় পাওয়া রেফারেন্স নম্বর লিখে রাখুন। এই নম্বর দিয়ে আবেদন ট্র্যাক করা যায় এবং সার্টিফিকেট তৈরি হলে নামানো যায়।
০৪দেরিতে নিবন্ধন: ২১ দিন থেকে ১ বছর
২১ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও নিবন্ধন সম্ভব। তবে এর জন্য নোটারি করা হলফনামা ও সামান্য বিলম্ব ফি লাগে, আর আবেদন সরাসরি স্থানীয় রেজিস্ট্রারের কাছেই করা যায়, উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে নয়।
তৈরি রাখার নথি
- সাধারণ নিবন্ধনের জন্য ওপরে বলা সব নথি
- মৃত্যুর তারিখ, সময় ও স্থান এবং দেরির কারণ জানিয়ে নোটারি করা হলফনামা
- স্থানীয় কাউন্সিলর, এক্সিকিউটিভ অফিসার বা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের ঘোষণাপত্র, যেখানে দপ্তর চায়
ধাপে ধাপে
- স্থানীয় রেজিস্ট্রারের দপ্তর থেকে দেরিতে নিবন্ধনের আবেদনপত্র নিন।
- হাসপাতাল বা চিকিৎসকের মৃত্যুর রেকর্ড, দাহ/সমাধির সার্টিফিকেট, পরিচয় ও বাসস্থানের প্রমাণ এবং নোটারি করা হলফনামা জুড়ে দিন।
- প্রযোজ্য বিলম্ব ফি-সহ স্থানীয় রেজিস্ট্রারের দপ্তরে আবেদন জমা দিন।
- রেজিস্ট্রার নথি যাচাই করে মৃত্যু নিবন্ধন বইয়ে নথিভুক্ত করেন।
- সার্টিফিকেট তৈরি হলে নিয়ে নিন। সাধারণত জমা দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মেলে।
০৫বিলম্বিত নিবন্ধন: ১ বছরের পর
যে মৃত্যুর সময়মতো নিবন্ধন করা হয়নি, তার জন্য এই পথ। অনেক বছর পরে সম্পত্তি হস্তান্তর, বিমার দাবি, পেনশন বন্ধ বা উত্তরাধিকারী সার্টিফিকেটের আবেদনের আগে প্রায়ই এটি লাগে। রেজিস্ট্রার কিছু করার আগে মহকুমা শাসক (SDO) বা এ কাজের জন্য অনুমোদিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ লাগে।
তৈরি রাখার নথি
- দাহ বা সমাধির সার্টিফিকেট, শ্মশান বা কবরস্থান থেকে
- মৃত্যুর প্রমাণ: পাওয়া গেলে হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানের মৃত্যুর সার্টিফিকেট, আর বাড়িতে মৃত্যু হলে চিকিৎসকের ডেথ স্লিপ
- মৃত ব্যক্তি ও আবেদনকারীর পরিচয়ের প্রমাণ
- মৃত ব্যক্তির বসবাসের সার্টিফিকেট, স্থানীয় কাউন্সিলর, পুরসভার এক্সিকিউটিভ অফিসার বা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের কাছ থেকে
- স্থানীয় পাঁচজন বাসিন্দার ঘোষণাপত্র, তাঁদের আধার বা ভোটার আইডির স্ব-প্রত্যয়িত কপি-সহ, যাতে মৃত্যুর ঘটনা ও আনুমানিক তারিখ নিশ্চিত করা হয়
- মৃত্যুর তথ্য এবং দেরির কারণ জানিয়ে নোটারি করা হলফনামা
ছবিতে ধাপগুলি
ধাপে ধাপে
- দাহ/সমাধির সার্টিফিকেট, পাওয়া মৃত্যুর প্রমাণ, পরিচয়ের প্রমাণ এবং মৃত ব্যক্তির বসবাসের সার্টিফিকেট জোগাড় করুন।
- স্থানীয় পাঁচজন বাসিন্দার ঘোষণাপত্র ও তাঁদের স্ব-প্রত্যয়িত পরিচয়ের কপি, সঙ্গে দেরির কারণ জানিয়ে নোটারি করা হলফনামা তৈরি করুন।
- নথি ও নির্ধারিত ফি-সহ SDO-র কাছে, অথবা এই কাজের জন্য অনুমোদিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করুন।
- SDO আবেদন খতিয়ে দেখেন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে তথ্য যাচাই করতে পারেন।
- সন্তুষ্ট হলে SDO স্থানীয় রেজিস্ট্রারকে মৃত্যু নথিভুক্ত করার লিখিত আদেশ দেন।
- আদেশটি রেজিস্ট্রারকে দেখান। তিনি নথিভুক্ত করে মৃত্যুর সনদ দেন। সার্টিফিকেট সরাসরি গিয়ে নেওয়া যায়, অথবা যেখানে ব্যবস্থা আছে সেখানে CRS পোর্টাল থেকে নামানো যায়।
e-District-এর মাধ্যমে অনলাইনে SDO-র অনুমতি
বিলম্বিত জন্ম নিবন্ধনের মতোই বিলম্বিত মৃত্যু নিবন্ধনের আদেশ চাইতে হয় মহকুমা শাসকের (SDO) কাছে। এখন মহকুমা দপ্তরে কাগজে আবেদন না করে পশ্চিমবঙ্গ e-District পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনেও তা করা যায়।
- আগে রেজিস্টার করা না থাকলে মোবাইল নম্বর ও ইমেল আইডি দিয়ে edistrict.wb.gov.in-এ রেজিস্টার করুন বা লগ ইন করুন।
- নাগরিক পরিষেবার অধীনে বিলম্বিত মৃত্যু নিবন্ধনের অনুমতি পরিষেবাটি বেছে নিন।
- মৃত ব্যক্তি ও আবেদনকারীর তথ্য, মৃত্যুর স্থান ও আনুমানিক তারিখ এবং নিবন্ধনে দেরির কারণ লিখুন।
- দাহ/সমাধির সার্টিফিকেট, নোটারি করা হলফনামা, পাঁচজন বাসিন্দার ঘোষণাপত্র এবং পরিচয় ও বাসস্থানের প্রমাণের স্ক্যান করা কপি আপলোড করুন।
- আবেদন জমা দিন। এটি ইলেকট্রনিকভাবে SDO-র দপ্তরে যাচাইয়ের জন্য যায়। কিছু আবেদনে স্থানীয় যাচাই লাগতে পারে।
- জমা দেওয়ার সময় পাওয়া আবেদন রেফারেন্স নম্বর (ARN) দিয়ে e-District পোর্টালে আবেদনের অবস্থা দেখুন।
- SDO অনুমতি দিলে তা পোর্টালে ডিজিটাল আদেশ হিসেবে মেলে। সেটি নামিয়ে স্থানীয় রেজিস্ট্রারকে দেওয়া যায়। তিনি তার পর নিবন্ধন সম্পূর্ণ করে সার্টিফিকেট দেন।
০৬স্ট্যাটাস দেখা ও সার্টিফিকেট ডাউনলোড
- অনলাইনে: আবেদনের সময় পাওয়া রেফারেন্স নম্বর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালে লগ ইন করে স্ট্যাটাস/ট্র্যাক অংশ খুলুন।
- সরাসরি গিয়ে: রেফারেন্স নম্বর বা আবেদনের প্রাপ্তিস্বীকার নিয়ে যে গ্রাম পঞ্চায়েত, পুরসভা বা পৌর নিগম সার্টিফিকেট দিচ্ছে তার দপ্তরে যান।
- সার্টিফিকেট তৈরি হলে দপ্তর থেকে ছাপা কপি নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণত একই পোর্টাল থেকে ডিজিটাল কপিও নামানো যায়। শ্মশান বা কবরস্থান থেকে প্রথম দু’টি কপি সাধারণত বিনামূল্যে মেলে, তার পর প্রতিটি অতিরিক্ত কপির জন্য নামমাত্র ফি লাগে।
০৭সরকারি লিঙ্ক ও সহায়তা
০৮প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পশ্চিমবঙ্গে ২১ দিনের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধন কি বিনামূল্যে?
হ্যাঁ। প্রথম ২১ দিনের মধ্যে নিবন্ধনে কোনও ফি লাগে না। আবেদন ২১ দিন থেকে ১ বছরের মধ্যে বা ১ বছরের পরের সময়সীমায় পড়লে তবেই খরচ লাগে। আর সঠিক অঙ্ক স্থানীয় সংস্থাভেদে আলাদা হতে পারে।
মৃত্যুর অনেক বছর পরেও কি মৃত্যুর সনদ পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, বিলম্বিত নিবন্ধনের পথে। এর জন্য দাহ/সমাধির প্রমাণ, নোটারি করা হলফনামা, স্থানীয় পাঁচজন বাসিন্দার ঘোষণাপত্র এবং SDO বা অনুমোদিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ লাগে। তার পর স্থানীয় রেজিস্ট্রার মৃত্যু নথিভুক্ত করেন।
মৃত্যুর কোনও হাসপাতাল রেকর্ড না থাকলে কী হবে?
হাসপাতালের রেকর্ডের বদলে চিকিৎসকের ডেথ স্লিপ বা সার্টিফিকেট, শ্মশান/কবরস্থানের রসিদ এবং বিলম্বিত ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘোষণাপত্র সহায়ক প্রমাণ হিসেবে চলতে পারে।
মৃত্যুর সনদ আর কী কী কাজে লাগে?
জীবন বিমার দাবি মেটানো, সম্পত্তি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হস্তান্তর বা নামজারি, পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের নথি বন্ধ করা এবং উত্তরাধিকারী বা উত্তরাধিকার সার্টিফিকেটের আবেদনের জন্য এটি সাধারণত লাগে।
বাড়িতে মৃত্যু হলে কি হাসপাতালে মৃত্যুর চেয়ে আলাদাভাবে নিবন্ধন করতে হয়?
নিবন্ধনের সময়সীমা ও ফি একই। তবে বাড়িতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের কাউকে স্থানীয় রেজিস্ট্রারকে খবর দিতে হয়। হাসপাতালের ডিসচার্জ রেকর্ডের বদলে সাধারণত চিকিৎসকের ডেথ স্লিপ বা হলফনামা দিতে হয়।
পশ্চিমবঙ্গ নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থার (CRS) বর্তমান পদ্ধতি, ফি এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী এই পাতা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও চূড়ান্ত তথ্যের জন্য সবসময় সরকারি CRS পোর্টাল বা স্থানীয় রেজিস্ট্রারের দপ্তর দেখুন।
